★★প্রসঙ্গঃ কোরবানি★★


 ★★প্রসঙ্গঃ কোরবানি★★

দীর্ঘদিনের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার প্রথায় সমাজে প্রচলিত গরু – খাসি কোরবানি দিয়ে কোরবানির ঈদের উৎসব পালন করা হয়। আমি আমার পোস্টে ধর্মের বাহিরের নিয়ম বা প্রথাগুলোর প্রতি বেশি গুরুত্বারোপ করিনা কখনোই কেননা প্রথা তো সবাই মানেই, পালনও করে! সেগুলা এমনিই প্রচারিত হয় আলাদা করে আমার প্রচার করে বলার কিছু নেই! প্রথা মানাতে আনন্দ আছে উৎসব আছে, ভোগ আছে আর সাধারন কিছু কষ্ট আছে, অনেক অপ্রিয় কিছু নেই, তাই সবাই কম বেশি মানে। যেটা মানুষ মানতে চায় না সেটা হলো প্রথার ভেতর যে স্রষ্টার আসল নির্দেশ, আসল সত্য সেটাই কেউ মানতে চায় না, দেখিয়ে দিলেও দেখতে চায় না, বুঝিয়ে দিলেও বুঝতে চায় না বরং সেটা সকলেরই অপ্রিয়!! তাই অল্পের দলে থাকা অধম আমি অপ্রিয় সত্যগুলাই সবসময় একটু বেশি ফোকাস করি। 

স্রষ্টা বলেছেন মধ্যমপন্থা উত্তম। তাই সবকিছুতে মধ্য পয়েন্ট থেকে ভাবাই নিরপেক্ষতা ও সাম্যতা। মধ্যমপন্থা মানে কোন পাশেই ঝুকে পড়া না বরং সমান ভারসাম্য রাখা। তাই কোরবানির মাংস খাওয়া নিয়ে অতি লোক দেখানো উৎসব নাচন যেমন অনুচিত তেমনি এত হিপোক্রেটও হওয়া উচিত না যে কোরবানির বিরোধিতা করা পশুপ্রেমের নাম করে যেখানে মানুষ নিজে প্রতি সপ্তাহে হাস মুরগীর রান চিবিয়ে আয়েশ করে খায়, সারাবছর চিকেনের বাহারী আইটেম খায় আবার ঈদ আসলে আলগা পশুপ্রেম দেখায় কেউ কেউ! যেহেতু আমি নিজেই হাস মুরগী যা জীব পাই চিবিয়ে ভীষণ মজা করে আয়েশ করে খাই আবার খাইতাছি সেটা দেখিয়ে দেখিয়ে ফেসবুকে পোস্টও দেই তো সেখানে শুধু ধর্মের কথা আসলেই আপত্তি থাকবে কেন?!! তাই ঈদে গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে হুট করে অতি উথলে পড়া ভালোবাসা দেখানোটাও একটু অতিভক্তি হয়ে যায়! অতিভক্ষণ যেমন ইবাদাতের লক্ষণ না তেমনি অতিভক্তিও মনের চোরামি বা হিপোক্রেসির লক্ষণ! 

স্রষ্টার প্রতিটা ইবাদাতের দুইটা রুপ থাকে একটা মেজাজি বা বাহ্যিক রুপ আরেকটা হলো ভেতরের সত্য রুপ বা হাকিকি রুপ! হাকিকি সত্যটা গ্রহন করতে না পারলে মেজাজিটা কোরবানি হয়না বরং সাধারণ মাংস ভোগের উৎসব হয়! সমাজে যখন মেজাজিটা অধিক আধিপত্য পেতে থাকে তখন মনের সত্যের মৃত্যু ঘটতে থাকে যদি মনের সত্যটা কেউ আগে ধারণ করতে না পারে! মেজাজি গরু খাসি কুরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে আসল সত্যটা মনে করিয়ে দেয়া! কেননা প্রকাশ্য বিষয় থাকলেই অপ্রকাশ্যটা মনে একটু হলেও নাড়া দেয়!! এজন্য স্রষ্টা কোরানে বলেই দিয়েছেন কোরবানির পশুর রক্ত মাংস তাঁর কাছে কখনো পৌছায় না যেটা পৌঁছায় সেটা হলো মনের তাকওয়া মানে পবিত্রতা! মনের কোন পবিত্রতাটা এবার বিসর্জনের মাধ্যমে অর্জন করতে পারলাম সেটাই পশুর বাহ্যিক রক্ত মাংসের চেয়ে স্রষ্টার নিকট অধিক প্রিয়। 

স্রষ্টাপ্রেমিকদের জন্য কোরবানি একটা বিসর্জনের শিক্ষা। যখন কোন সত্তা স্রষ্টার সাথে কানেক্টেড হতে থাকে তখন স্রষ্টার একটা ইচ্ছার জন্য নিজের প্রিয়জন বা প্রিয় কিছুকেও মন থেকে বিসর্জন দিতে হয়। এটা মনকে বৈষয়িক মোহবন্ধন থেকে মুক্ত করে! কেননা মৃত্যুর পর বৈষয়িক জীবনের সবচেয়ে প্রিয় জনকেও ছেড়ে যেতে হয় এটাই অপ্রিয় সত্য। এছাড়া আমাদের সকলেরই অধিক প্রিয় বৈষয়িক রিপুর লোভ মোহ মায়া আছে যেগুলা ত্যাগ করার শিক্ষা বেঁচে থাকতেই অর্জন করতে হয়। তাহলেই মৃত্যুরুপ সত্যকে সাদরে আলিঙ্গণ করা যায়, শাস্তিরুপে না। তাই সে সত্যকে যুগে যুগে সকল স্রষ্টাপ্রেমিকই জীবন থাকতেই কষ্ট করে মন থেকে গ্রহন করে নিয়ে হয়েছেন অমর!! কোরবানির প্রচলনও আসে এই প্রিয় পুত্র কোরবানির পরীক্ষার মধ্য দিয়ে! যার মানে দাঁড়ায় স্রষ্টার সাথে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষকে বা প্রিয় কোন জিনিসকেও শরীক করা যায় না! তার ইচ্ছাই সর্বময়! আজকে ইব্রাহীম নবীর কোরবানি কবুল হওয়াতে আমরা উৎসব করি ভালো কথা কিন্তু স্রষ্টা যদি জিজ্ঞেস করেন তুমি নিজে কি শিক্ষা অর্জন করেছিলে কোরবানি উৎসব থেকে? তুমি নিজে কোন প্রিয় জিনিসটা কোরবানি দিয়েছো আমার জন্য? তখন কি উত্তর দেবো? গরু? খাসি? বাজার থেকে কিনে আনা একটা গরু খাসি কিভাবে আমাদের সবচেয়ে প্রিয় হতে পারে? 

 তাই কোরবানির মূল উদ্দেশ্য যে লোকেরা ভুলে যায় সে লোকেরা না নিজের নিয়তকে কোনদিন পবিত্র করতে পারে আর না নিজের মোহরুপ বন্ধন থেকে আজীবন মুক্ত হতে পারে!! 

আর মেজাজি পশু কোরবানি করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে বিতরন করার মাধ্যমে ত্যাগের উৎসব পালন। ত্যাগের আনন্দ গ্রহণ। এটা গরীবদের জন্য মাংস খাবার আনন্দ কিন্তু যারা অবস্থাশালী তাদের জন্য ত্যাগের আনন্দটাই প্রকৃত আনন্দ। ধনীরা সারাবছর ভোগই করে তো ঈদেও যদি সেটাই করতে থাকে তাহলে ত্যাগ টা কোথায? অধিকাংশটা বিতরণের মধ্যেই আছে ত্যাগ। কিন্তু দুঃখজনক হলো পশু কোরবানিটা এখন ধনীদের ধর্মীয় উৎসব হিসেবে এতই বেশি প্রচলিত হলো যে কোথায় কোরবানির মূল উদ্দেশ্য ছিলো প্রিয় বিষয়গুলোর লোভ মোহ বিসর্জন, সেখানে মানুষ বরংচ এখন অতিরিক্ত খরচ করে আহার ভোগের বিরাট আয়োজন করে বরং আরো বেশি ভোগ মোহে আটকে যায়!! গরু খাসি যদি কোরবানি দিয়ে বেশিরভাগটা বিতরণই না করে ফ্রিজ ভর্তি করার নিয়ত থাকে তবে এর মেজাজি উদ্দেশ্যই বা কতটা সফল হলো!!? এখানে দানের চেয়ে বেশি মূখ্য বিষয় হলো কার কত বড় ফ্রিজ ভরে কয়েকমাসের মাংস মজুদ করতে পারে সেই প্রতিযোগিতা!!  কে কয় টাকার গরু কিনলো সে বাহাদুরী! মানে ইবাদাতের উদ্দেশ্য এবং দানের চেয়ে বেশি বরং সামাজিক প্রতিযোগিতা সম্মানের বিষয়রুপ একটা ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে। 

 এজন্য এবার ঈদে লক্ষ লক্ষ গরু খাসি কোরবানি হবার পরও অধিকাংশ মানুষেরই মনের কোন নৈতিক পরিবর্তন হবে না!! বরং অতিরিক্ত আহার ভোগ করে নিজের স্বাভাবিক নফসের নিয়ন্ত্রণ হারাবে! প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাংস ভোগ করা মানুষের নফসকে আরো লোভী, ভোগী ও হিংস্র মনোভাবের করে তোলে!! কোরবানির নামে ত্যাগের শিক্ষা থেকে ত্যাগই বিলুপ্ত হয়ে ভোগই প্রাধান্য পেলে সেখানে ত্যাগটা আর থাকে কোথায়? নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন আহার ভোগই মানুষকে সুন্দর ও ত্যাগী মানুষ হতে দেয় না বরং কাফের ও হিংস্র পশুস্থরেই নামিয়ে দেয়, এ কথা আমি বলিনি বরং স্রষ্টাই বলেছেন।

 “”আর যারা কাফের, তারা ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে এবং চতুস্পদ জানোয়ারের মত আহার করে। তাদের বাসস্থান জাহান্নাম”” [সূরা মুহাম্মদ : ১২]

তাই কোরবানি মানে অতিরিক্ত লোক দেখানো খরচ করে, লোক দেখানো দান করে বেশিরভাগটা নিজের পেট পূজা করার উদ্দেশ্যে সংরক্ষণ করা না। এটা কিন্তু কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা না। এজন্য আস্ত তিনটা গরু কোরবানি দিয়ে দুইটা নিজের ফ্রিজে ভরে বাকী একটা লোক দেখানো বিতরন করা মানে নিজের উদর পূর্তির জন্য অপচয় করা। তার চেয়ে তিনটার জায়গায় একটা মাত্র গরু কোরবানি দিয়ে বেশিরভাগটা বিতরণ করে দেয়াটাই সাম্য ও সুষম বন্টন এবং অতিরিক্ত পশুর প্রাণও অপচয় হলো না তাতে করে। 

 তাই কোরবানি মানে কখনোই সামাজিক আহার ভোগের উৎসব করা না বরংচ প্রথমত, কোরবানি মানে প্রিয় জিনিস মন থেকে বিসর্জন দেয়া, মানে প্রিয় যে কোন কিছু বা যে কোন জন থেকে স্রষ্টাকে উর্ধ্বে রাখা! আর দ্বিতীয়ত পশু কোরবানি দেয়া মানে নিজের পশু প্রবৃত্তিকে বিসর্জন দেয়া। তৃতীয়ত, মেজাজি বা প্রকাশ্য কোরবানির মাধ্যমে অধিকাংশ অংশটাই অসহায় গরিবদের আহারের জন্য দান করে দেয়া এবং নিজে পরিমিত কিছু আহার গ্রহন করা। এ সত্য নিয়ত ও উদ্দেশ্য নিয়ে কেউ কোরবানি দিলে অবশ্যই তার কোরবানি স্রষ্টার দরবারে গৃহীত হবে।

লিখেছেন — ইসরাত জাহান

Thanks For You Reading The Post We are very happy for you to come to our site. Our Website Domain name https://www.atikurbd.com/.
নবীনতর পোস্টসমূহ নবীনতর পোস্টসমূহ পুরাতন পোস্টসমূহ পুরাতন পোস্টসমূহ

আরও পোস্ট

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন