"শেষ স্টেশন"

"শেষ স্টেশন"


                                        -'পরাবাস্তব অনুগল্প-০১ঃ              


  'শেষ বলে কিছু নেই, শেষ থেকেই শুরু হয় গল্পের'


--
রাতের গাঢ় আঁধার ভেঙে ছুটে চলেছে দ্রুতগামী 'চট্রগ্রাম এক্সপ্রেস' ট্রেন রাতের আকাশে ঘন কালো মেঘ বাতাসে রাতের অনাহারী চাঁদ, কলঙ্কিত করে রেখেছে  যেন নিজেকে কুয়াশা ধোঁয়া চাঁদের লুকোচুরি খেলায় আকাশের তাঁরা গুলো সাথি হয়েছে ছুটে চলছে রাতের ট্রেন সহস্রাধিক যাত্রী নিয়ে গন্তব্য চট্রগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন খুব বেশি স্টেশনে থামে না ট্রেনটি মাঝে দু'একটা জনবহুল স্টেশন ছাড়া কিছু যাত্রী ওঠে কিছু যাত্রী নেমে যায় ট্রেন থেকে 


ছিন্নমূল অনেক মানুষের দেখা মিলে ট্রেনটিতে আছে প্রথম দ্বিতীয় শ্রেনীর রেলওয়ে বগি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বগি আছে কিছু তৃতীয় শ্রেনীর বগি গুলো বেশি ঘটনাবহুল আর জনসমাগম বেশি হয় চা, সিগারেট, পান, সবি পাওয়া যায় হকারদের কাছে গানের সূরে সূরে ভিক্ষে করে গরীব মানুষ গুলো আর পাওয়া যায় স্বপ্নে পাওয়া সর্ব রোগের মহা ওষুধ এক ওষুধে সকল রোগ মুক্তি মান্নান মিয়াঁর তিতাস মলম পাওয়া যায় সংবাদপত্র বিক্রি করে অনেকে বিখ্যাত সব গল্পের বইয়ের বাঙালি সংস্করণ বিক্রি করে অনেক হকার



তুলনামূলক ফাঁকা একটা প্রথম শ্রেনীর বগিতে বসে আছেন জনপ্রিয় একজন 'আলোকচিত্র শিল্পী' মধ্য বয়স্ক সুনীল রায় সাথে ক্যামেরা; ফাইল রাখার ব্যাগ নিতান্ত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তেমন নেই যেমন কাপড়ের ব্যাগ চোখে মুখে বয়সের ছাপ পড়েছে গম্ভীর আর অল্পভাষী মনে হলো চেহারার তুলনায়- চোখে নিস্প্রভ একটা ক্লান্তি চোখে পড়ে হাতে মোটামুটি বলতে গেলে দামী একটা ঘড়ি তবে পুরোনো ক্যামেরাটা পুরোনো নতুন একটা ভালো ক্যামেরা কিনবার টাকা মনে হয় নেই বেশ একটা অস্থিরতা আছে স্বভাবে পুরোনো দিনের মানুষের মত লাগে দেখতে কেতাদুরস্ত কোন ভাব নেই, শান্ত একটু ভাবনাগ্রস্ত মানুষ একটু অগোছালো যেন 


ট্রেনটি রাতের বিরতি নেয়া শেষ স্টেশনটায় থেমে আছে একজন বৃদ্ধ পান-সিগারেটের হকার করুন সূরে বলছে পান লাগবে পান ভালো সিগারেট আছে চা আছে লাগবে চা পান লাগবে পান বলতে বলতে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলো একবার সাথে সাথে কোথা থেকে দৌড়ে এসে কম বয়সি একটা ছেলে তুলে ধরলো বৃদ্ধটাকে কিছু হইনি তো ঠিক আছেন বৃদ্ধ বললো হুম ঠিক আছি বাবা ছেলেটা অল্প কিছু সিগারেট আর চকলেট কিনে; ট্রেনের দরজার কাছে গিয়ে বিরস মনে সিগারেট টানতে লাগলো ট্রেন আবার চলতে শুরু করেছে


এতক্ষণ একমনে এসব দেখছিলেন সুনীল রায় কিছুটা বিভ্রান্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে এখন সিগারেট ধরানো ছেলেটার দিকে সুনীল রায় মনে হয় সিগারেট খান না তাই আগ্রহ নিয়ে সিগারেট খাওয়া দেখছিলেন ট্রেনের বগির দরজায় দাড়িয়ে সিগারেট খাওয়া বেশ মজার মনে হয়


এসব দেখতে দেখতে নিজের মনে ক্যামেরা আর নিজের কাগজপত্র গুলো গুছিয়ে নিলেন তিনি আনমনে ট্রেনের বাইরের রাতের পরিবেশ দেখছেন সুনীল রায় ট্রেন এখন দ্রুত গতিতে ছুটছে নিজের গন্তব্যের দিকে জানালার বাইরে রাতের আঁধারের লুকোচুরি বিষন্ন সময়ের স্মৃতিকথা মনে পড়ে এমন আঁধারে সুনীল রায় কি যেন ভাবছিলেন নিজের মনে চুপচাপ নিরিবিলি শান্ত পরিবেশ ট্রেনের বগিটায় আলো ছায়ার খেলা বাইরে থেকে কিছু আলো আসছে বগিতে


এমন সময় হঠাৎ তার পাশে বসা প্রায় তার সমবয়সি একজন যাত্রী বললেন 


গল্প শুনবেন একটা? বসেইতো আছেন একা চুপচাপ


আমাকে বললেন


জ্বি আপনাকেই বলেছি; এখনো কিন্তু অনেকটা পথ বাকী 


ভালো করে লোকটাকে একবার দেখে নিলেন সুনীল রায় প্রায় তার বয়েসি মানুষ শান্ত আর লম্বাটে রোগাক্রান্ত চেহারা চোখে পুরু কাচের চশমা পড়াঅনেকটা পুরোনো চশমা চশমার লেন্স কয়েকবার বদল হলেও চশমাটা বদল হয়নি অনেক দিন তার চোখে মুখে বয়সের ছাপ পড়েছে ভাঙাচোরা একটা চেহারা


কিছুটা ভেবে সুনীল রায় বললেন 'হুমম'.. গল্প বলবেন! আচ্ছা ঠিক আছে বলেন... 


নিজেকে কিছুটা গুছিয়ে নিয়ে ধীর আর শান্ত গলায় গল্প বলা শুরু করলেন কায়সার মাহমুদ


ঢাকায় একটা সরকারি অফিসে ছোটখাটো একটা চাকরী করি অফিস সহকারি হিসেবে গ্রামের বাড়ি চিটাগাং কাজের প্রয়োজনে অনেক সময় বহুদিন গ্রামের বাড়ীতে ফেরা হয়ে উঠেনা ছোট একটা চাকরি; সরকারি হলেও অসৎ টাকা হস্তগত করি না আর পরিশ্রমের উপার্জন ছাড়া অন্য কোন সেকেন্ড অপশন নেই আমার কাছে একটু বেশি বয়সে বিয়ে করেছিলাম বিয়ের অনেক দিন; অনেকগুলো বছর চলে গেলে আমাদের ঘরে কোন সন্তান হচ্ছিলো না মনটা খারাপই থাকতো সবসময় চাকরী আর বেতনের অত জোর নেই যে নিজের স্ত্রীকে ঢাকায় এনে তুলবো ছুটিছাটা পেলে সময় করে বাড়ীতে যেতাম এমন সময় আল্লাহ মুখ ফিরে চাইলেন--


বলে আনমনে ভাবলেন কিছুক্ষণ হতাশা নাকি ক্লান্তি বোঝা গেলো না নিজের অভাবের কথাগুলে শুনাবেন নাতো আবার শান্ত মনে ভাবছিলেন সুনীল রায় 


গত সাত বছর আগের কথা; সেদিন ছিলো ঝড়ের রাত রাত বারোটার কাছাকাছি সময় চট্রগ্রাম এক্সপ্রেসে করে বাড়ীতে যাচ্ছি আমার প্রথম কন্যা সন্তান পৃথিবীতে আসবে সরকারী  অফিসের ছোট একটা চাকরী করি ঢাকায় তাই; অফিসের খুব জরুরী একটা কাজ শেষ করে ঢাকা থেকে ফিরছি আমার প্রথম কন্যা সন্তান তখন আমার স্ত্রীর গর্ভে; হাসপাতালে এ্যাডমিট করা হয়ে ছিলো ডাক্তার নির্দিষ্ট সময় জানিয়ে দিয়েছেন বেবি হওয়ার হাসপাতাল থেকে সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে সেদিন রাত বারোটায় মোবাইলে আমি আমার সদ্য ভুমিষ্ঠ হওয়া কন্যা সন্তানের কান্নার আওয়াজ শুনি


কেমন এক অভূতপূর্ব অনুভূতি তা বলে বোঝাতে পারবো না আপনাকে আনন্দে চোখে পানি চলে এসে ছিলো 


বলে বাচ্চা ছেলেদের মত কালো সস্তা ধরনের পুরু কাঁচের পুরোনো চশমা মুছতে লাগলেন তিনি 


'তারপর' আপনি কি করলেন বললেন সুনীল রায়


আমি হাসপাতালে আমার স্ত্রীকে বললাম, তুমি ভেবে না আমি যতদ্রুত সম্ভব হাসপাতালে চলে আসছি তুমি চিন্তা করো না কিছু আমি ট্রেনে বসেই আমার মেয়ের নাম নিয়ে ভাবছি একটা নাম মাথায় আসলো 'রাত্রি' আমি আমার স্ত্রীকে মোবাইল করে জানালাম আমার প্রথম কন্যা সন্তানের নাম 'রাত্রি' রাখলাম সবাই খুব খুশি হলো আমার উচ্ছাস দেখে আমার স্ত্রী রাবেয়া প্রথম সন্তান প্রসবের অক্লান্ত কষ্ট সহ্য করার পরও ক্লান্ত শরীরে হাসতে চেষ্টা করলো আমি এতটা দূর থেকে ওর কষ্টটা উপলব্ধি করতে পারছিলাম এমন সময় হঠাৎ...


এমন সময় হঠাৎ কি হলো চুপ করে গেলেন যে বলুন ভালোই তো লাগছে; লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই আমরা দুজনেই প্রায় সমবয়সি বললেন সুনীল রায়


এমন সময় হঠাৎ...আমাদের ট্রেন টি চলন্ত অবস্থায় মারাত্মক ভাবে  ঝাঁকি দিয়ে উঠলো; আমাদের চলন্ত ট্রেনটি লাইন চূত হয়ে অন্য একটি লাইনে গিয়ে উঠেছে- মনে হলো না কি হয়েছে বুঝতে পারলাম না ঠিকমত 


আমাদের ট্রেনের চালক পুরো দমে ট্রেনটি থামাতে চেষ্টা করছিল কেন জানি আমার মনে হলো ভুলক্রমে রুট ফেল করেছে কিন্তু আমরা চলন্ত ট্রেনে তার থেকেও বড় বিপদে ছিলাম কারন রুট এলোমেলো হয়ে যাওয়ার কারনে আমাদের ট্রেনটি ঢাকাগামী আরেকটি ট্রেনের সাথে মুখিমুখি সংঘর্ষে বিধ্বস্ত হলো; ট্রেন ভেঙ্গেচুরে পতন ঘটলো অনেক মানুষ ভর্তী বগীর বহু মানুষ মারা গেছে সেই ট্রেন দূর্ঘটনায় পত্রিকায় সংবাদ হয়েছিলো, নিশ্চয়; পড়েছেন!


কি একটা হৃদয়বিদারক পরিবেশ ছিলো এক্সিডেন্টের সময় চারিদেকে শুধু মৃত্যু আর মৃত্যু; লাশ আর লাশ 
মৃত্যুর মিছিলে মানুষ সমবেত হয়েছিলো আত্ম চিৎকার দিয়ে আর হাহাকার, কান্না, যন্ত্রণা সব কিছু ছাপিয়ে প্রিয়জন হারানো চিৎকারে আকাশ, পৃথিবী সব কিছু এক হয়ে গিয়েছিলো মুহূর্তেই চারিপাশে শুধু মৃত্যুর কবক্ষ নিকষ কালো ছায়া আজো তার ছায়া পড়ে চট্রগ্রাম এক্সপ্রেসে এই রুটে বলে তাকালেন সুনীল রায়ের আতংকিত নিশ্চুপ মুখের দিকে


সুনীল রায় সব শুনে বললেন আপনি তাহলে মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখলেন! জীবনের কিছু কিছু ঘটনা কিছু কিছু মহূর্তে আমাদের জমানো স্মৃতি আমাদের ভীষণ ভাবে নাড়া দেয় সব কিছু বদলে দেয় আমরা শত চাইলে তখন তেমন কিছু করতে পারি না সহজ স্বাভাবিক জীবন চলতে থাকলে; হুট করেই বিধাতা নারাজ হয়ে যান তাঁর মনে হয় সহজ জীবন হলে তো কেউ আমাকে স্মরণ করবে না তাই বিপদে ফেলে নিজের গুনগান শুনতে পছন্দ করেন তিঁনি আমাদের সাথে এমনি হয় সবসময় 


'আপনি আপনার মেয়ের কাছে ফিরে গিয়েছিলেন!'


হুম গিয়েছিলাম বলে উদাস হয়ে রাতের ট্রেন থেকে বাইরে আকাশের দিকে তাকালেন; কালো পুরু কাঁচের চশমা চোখের 'কায়সার মাহমুদ' এক ধ্যানে বাইরে তাকিয়ে আছেন রাতের আঁধারের ছুটে চলা ট্রেনটির বাইরে, ফেলে চলা স্টেশন গুলোর দিকে মনোনিবেশ করলেন


গভীর রাতের চট্রগ্রাম এক্সপেস ট্রেন ছুটে চলছে
ট্রেনের অদ্ভুত নেশা ধরা শব্দ হচ্ছে


 ঝিকঝিক ঝিকঝিক ঝিকঝিক.... 


রাতের আকাশ নিরবতা নিয়ে ঝুলে আছে ট্রেনের জানালায় দূরে কিছু জনবসতি আর তার টিপটিমে ইলেক্ট্রিসিটি বাল্ব জ্বলছে মৃদুমন্দ হাওয়ায় শীতলতা ছুঁয়ে যাচ্ছে ট্রেনের জেগে থাকা রাতের যাত্রীদের মনে


নতুন কোন নাম না জানা স্টেশন পেরনোর সময় হুইসেল দিয়ে ছুটে যাচ্ছে ট্রেন 


কু-ঝিকঝিক ঝিকঝিক..


এমন সময় সুনীল রায় বললেন 'হুম' তাহলে, আপনি আর কিছু বলবেন না জীবনের চাওয়া পাওয়া আর সকল ইচ্ছেগুলো যখন জীবনে এসে ধরা দেয় তখনি সব কিছু বদলে যায়, এলোমেলো হয়ে যায় সব কিছু এইযে দেখুন না বিয়েই করলাম না এক জীবনে আপনার তো তাও একটা গল্প আছে আমার বলার মত তাে তাও নেই কিন্তু সবার গল্পটার শেষটাই কিন্তু এক; আপনার, আমার, সবার কিছু মনে না করলে রাতের ট্রেনের জ্বলন্ত এই দূর্ঘটনার সাক্ষী! আপনার- একটা আলোকচিত্র তুলতে পারি? আমি একজন আলোক চিত্র শিল্পী; নাম সুনীল রায় 


হুম; আমি কায়সার মাহমুদ ছবি তুলবেন ঠিক আছে 
বলে হাসতে চেষ্টা করলেন অদ্ভুত আলো ছায়ার আদলে শান্ত শীতল কন্ঠে বললেন মৃত মানুষের ছায়া আছে জানেন তাঁদের ছায়া ঘুড়ে ফেরেন 


চিত্র ফ্রেম বন্দি করার মূহূর্তে; সুনীল রায় বললেন হুম জানি; দেখছেন না আমার ছায়া আছে


কায়সার মাহমুদ আনমনে হতাশা নিয়ে বললেন ছবি তুলে লাভ নেই ভাই আমার ছবি ধোলাই করলে শুধু মৃত্যুর ছায়াটাই দেখতে পাবেন বুঝলেন! আলো ছায়ার কোন দৃশ্য আপনি চাইলেও ফ্রেম বন্ধি করতে পারবেন না


'আমি জীবত নই একজন পরপারের মৃত মানুষ'


শীতল চেখে নির্লিপ্ত কন্ঠে সুনীল রায় বললেন 'হুম' বুঝেছি পৃথিবীতে আলো ছায়ার একটা দুনিয়া তো আছে আলো আছে ছায়া থাকবে না বিশাল এই পৃথিবীর কতটুকুই আর আমরা জানি আলো ছায়ার এই জগতে আমার ক্যামেরা আর আমি দু'জনেই অনেক পুরোনো আর মৃত মারা গেছি সেই সেদিন ঝড়ের রাতে চিটাগাং এক্সপ্রেসে ক্যামেরার মায়া কাটিয়ে উঠতে পারিনি আজো তাই ক্যামেরা হাতে আমার ছায়া এই রুটেই রাতের বেলা ঘুড়ে ফেরেন 


বলে রক্তশুন্য বিমর্ষ হাসি দিতে চেষ্টা করলো 'আলোকচিত্র শিল্পী' সুনীল রায় 


নিজের মতন আরেকজন মৃত মানুষকে দেখে কায়সার মাহমুদ কিছু বললেন না চুপ করে রাতের ট্রেনের হুইসেল শুনছেন শেষ স্টেশন চলে এসেছে কাছেই


চারিদেকে শুনশান নিরব আঁধারের আধো আলো নিরস প্রাণহীন একটা সময় রাতের বাতী গুলো নিভে গেছে অনেক আগেই ঘুমন্ত এক অন্ধকারের খেলা এই পৃথিবীর সমস্তটা জুড়ে রাতের আঁধার ভেদ করে, ঘুম থেকে জেগে উঠা দু