আজ ২২ মে, শ্রমিক বিদ্রোহের ১৪ বছরে পদার্পন করলো

Gwtuc
২২,মে ২০২০
২২ মে, শ্রমিক বিদ্রোহের ১৪ বছরে পদার্পন করলো আজ। ২০০৬ সালের এই দিনে নিয়োগপত্র, পেশাগত নিরাপত্তা, ছাঁটাই বন্ধ, জীবনমান মজুরি, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারসহ বিভিন্ন দাবিতে গার্মেন্টস শ্রমিকরা বিদ্রোহ করেছিল। আশুলিয়ার ইউনিভার্সেল কারখানা থেকে এ বিদ্রোহ শুরু হলেও এ বিদ্রোহের ঢেউ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। পোশাক শিল্প ৭০ এর দশকের শেষের দিকে যাত্রা শুরু করে প্রায় তিন দশকে বঞ্চনা ও অবহেলার শিকার হওয়ার মধ্যে দিয়ে শ্রমিকদের মাঝে যে ক্ষোভ জমা হয়েছিল এই বিদ্রোহের মধ্যে তার বিস্ফোরণ ঘটে। সেদিন প্রশাসন স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। দিশেহারা হয়ে পড়েছিল তৎকালিন সরকার।
কাকতালীয়ভাবে দুটি ভিন্ন সংগঠন ভিন্ন স্থান থেকে এ বিদ্রোহের সুত্রপাত করেছিল। একটি আশুলিয়ার ইউনিভার্সেল সোয়েটার কারখানার শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবি দাওয়ার আন্দোলন। যার নেতৃত্বে ছিল ইদ্রীস আলীর নেতৃতাধীন গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (জিটিইউসি)। অপরটি গাজীপুরের মাওনার এসকিইউ সোয়েটারে ছাঁটাই বন্ধের আন্দোলন। যার নেতৃত্বে ছিলেন মোশরেফা মিশুর নেতৃতাধীন জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফেরাম। এ সময় মাওনায় একজন শ্রমিক হত্যার ঘটনা ঘটে।
এ সময়ে জিটিইউসির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য মোটিভেটেড সভা করছিল। আশুলিয়ার পল্লী বিদ্যুৎ, বগাবাড়ী, জামগড়া প্রাইমারি স্কুলসহ বিভিন্ন মেচে তাদের সভাগুলো চলতো। সংগঠনটির কেন্দ্রীয সভাপতি ইদ্রিস আলী সে সময় আশুলিয়ায় গার্মেন্ট শ্রমিকদের সংগঠিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। সে সময়ের বিভিন্ন সভায় সিবিপির সাবেক সভাপতি শ্রমিক নেতা শহিদুল্লাহ চৌধুরী, ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান, অধ্যাপক এম এম আকাশসহ শ্রমিক নেতারা উপস্থিত থেকে শ্রমিকদের সাংগাঠনিক শিক্ষা বৈঠকে।
গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাভার আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি আলী রেজা তুহিন চৌধুরী ইউনিভার্সেল সোয়েটার কারখানাতে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকেই আন্দোলনটা ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো আশুলিয়ায়। সেদিন পুরো আশুলিয়া অগ্নিগর্ভে পরিনত হয়। বন্ধ হয়ে যায় আশুলিয়া সড়ক,দোকান পাঠ-সব কিছু। সড়কের বিভিন্ন প্রকার যানবাহন ও কারখানাতে অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনের উত্তাপে গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে সংহতি জানাতে শ্রমিকরা আসতে থাকে। আশে-পাশের বিভিন্ন শিল্প কারখানা ও সেবা প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরাও যোগ দেয় বিক্ষোভে। কারখানা মালিকদের নির্যাতন ও অন্যায় ছাঁটাইয়ের শিকার হয়ে যে সব শ্রমিক আশে পাশে বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন পেশা বেছে নিয়ে জীবন নির্বাহ করছিলেনর, তারাও সেদিন যোগ দেন এই বিদ্রোহে। এ বিদ্রোহ নির্দিষ্ট দাবিতে আশুলিয়ার ইউনিভার্সেল কারখানা থেকে শুরু হলেও তা ছড়িয়ে পড়ে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। এ বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে সংগঠকদের নিয়ন্ত্রাণাধীন এলাকার বাইরে। গার্মেন্ট শ্রমিক সলিডারিটিসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের কর্মীরা বেরিয়ে আসে। গার্মেন্ট মালিকদের শোষণ বঞ্চনা ও নিপীড়নে অতিষ্ট শ্রমিকরা প্রতিশোধ হিসাবে এই বিক্ষোভে বিদ্রোহে সামিল হয়। আন্দোলনের তীব্রতা এমন পর্যায়ে পৌছে যে, এই প্রতিবেদক সেদিন ফোনে কথা বলতে চাইলে অনেক শ্রমিক নেতা তাদের সংগঠনের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করে।
এ আন্দোলনে তৎকালিন বিএনপি-জামাত সরকার অনেকটা দিশেহারা পড়ে। পোশাক কারখানাসমূহে ট্রেড ইউনিয়ন কার্যকর না থাকার কারণে আন্দোলনের নির্দিষ্ট দাবি দাওয়া বা নেতাকেও পাওয়া যাচ্ছিলো। তৎকালিন সরকারের প্রভাবশালী নেতারা সচিবালয়ে বৈঠক বসে। জাতীয় আন্দোলনের শ্রমিক নেতাদের সুত্র ধরে আশুলিয়া ও ইউনিভার্সেল সোয়েটার কারখানার নেতাদের ডেকে এনে ওই বৈঠকে বসানো হয়। এ আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে শেষে সরকার ন্যুনতম মজুরি বোর্ড গঠন ও শ্রম আইন-২০০৬ করতে বাধ্য হয়। এ বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে গার্মেন্ট শ্রমিকরা ভিত্তি তৈরি করে।
এ ব্যাপারে জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফোরাম বিদ্রোহ কালিন সময়ের সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, ২০০৬ সালের ২২ জানুয়ারি শ্রমিক আন্দোলন ছিল সব চেয়ে বড় আন্দোলন। আন্দোলন পূর্ব শ্রমিকদের আইডি দেওয়া হতো না, ন্যুনতম মজুরি ছিল সর্বনিন্ন। ২২ মে আন্দোলনে মধ্যে এ সংকট দূর হয়। কিন্তু ২০০৬ সালের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অর্জনটা হয়েছিল তা আবার হোচট খায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। তারপরও শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা সূচনা হয়েছিল ওই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। মালিকরা বুঝেছিল শ্রমিকরা সংগঠিত হলে কোনভাবেই দাবিয়ে রাখা যাবে না।
২০০৬ সাল ২০২০ সাল। ১৪ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। এ সময়ে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের যেমন ধারাবাহিকতা সৃষ্টি হয়েছে , তেমনি মালিকদের জুলুমও বেড়েছে। ২০১৬ সালে শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন করলো আর বাতিল হওয়া ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা করা হলো। শ্রমিকরা দাবির কথা বললেই শিল্পাঞ্চলে সামরিক আইন জারির অবস্থা সৃষ্টি করে রাখা হচ্চে।
গার্মন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ (জিটিইউসি) বিদ্রোহকালিন সময়ের সভাপতি ইদ্রিস আলী এই প্রতিবেদককে বলেন, ২০০৬ সালের আগ পর্যন্ত মালিকরা গার্মেন্টস শ্রমিকদের শ্রমিক হিসাবে মনে করতো না। মালিকরা মনে করতো গার্মেন্টস শ্রমিকদের কাজ পাওয়াটা তাদের দয়া। তাই শ্রমিকদের দিয়ে ইচ্ছামত কাজ করাতো, শ্রম আইনের বাস্তবায়ন ছিল না, বেতন ছিল সর্বনিম্ন।
জাতীয় শ্রমিক নেতৃবৃন্দ গার্মেন্ট শ্রমিকদের শ্রমিকের মর্যাদা দিতে চাইতো না। এ সব নেতাদের মাঝেও হতাশা বিরাজ করছিল। বড় বড় শ্রমিক নেতা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে ভিড়ে গিয়ে এমপি মন্ত্রী হয়ে গিয়েছিল। ফলে গার্মেন্টস শ্রমিকরা অবহেলিত ছিল। ২০০৬ সালের ২২ আগস্ট শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধি, ছাঁটাই বন্ধ, নির্যাতন বন্ধ ও স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিল। সকল কারখানাতে একই বঞ্চনা থাকার কারণে আশুলিয়ার ইউনিভার্সেল সোয়েটার কারখানার এ কর্মর্সূচি শ্রমিক বিদ্রোহের রুপ নিয়েছিল।
২০০৬ সালের ২২ মে গার্মেন্টস শ্রমিকদের এই বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের দাবি কী পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা হয়েছে? শ্রমিক নেতাদের বক্তব্য হলে- না, তা হয়নি। কিন্তু শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রকাশ হয়েছিল মাত্র। সে অর্থে শ্রমিকদের অধিকার আন্দোলনের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা হওয়ার দিন ২২ মে। এ ব্যাপারে বিদ্রোহকালিন সময়ে ইউনিভার্সেল সোয়েটার কারখানার শ্রমিক নেতা, জিটিইউসি’র সাভার-আশুলিয়ার আঞ্চলিক কমিটির তৎকালিন সভাপতি ও বর্তমান পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সভাপতি তুহিন চৌধুরী বলেন, সে সময় যে দাবিতে আন্দ্লোন করেছিলাম তা সারা দেশের গার্মেন্ট শ্রমিকদের স্পর্শ করেছিল। মালিকদের বঞ্চনার বিরুদ্ধে শ্রমিকদের মধ্যে যে ক্ষোভ ছিল তা প্রকাশ করেছিল মাত।
সেদিনের তুলনায় আজকে পরিবেশের অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। মালিক পক্ষ শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ শক্তি দেখেছ, আবার শ্রমিকদের দমনের জন্য নতুন মাত্রায় শক্তিও প্রয়োগ শুরু করেছে। সেদিন দাবি-দাওয়া দিয়ে কারখানার ভেতরে-বাইরে সমাবেশ করা যেত, কর্মসূচি দেওয়া যেত। এখন গার্মেন্টস শ্রমিকদের অবদানের কথা মুখে মুখে স্বীকার হলে শ্রমিকদের সকল অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কোন দাবির কথা বললেই ছাঁটাই করা হয়। ট্রেড ইউনিয়ন করার করার চেষ্টা করা হলে মামলা দিয়ে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।
Thanks For You Reading The Post We are very happy for you to come to our site. Our Website Domain name https://www.atikurbd.com/.
নবীনতর পোস্টসমূহ নবীনতর পোস্টসমূহ পুরাতন পোস্টসমূহ পুরাতন পোস্টসমূহ

আরও পোস্ট

মন্তব্য

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন