অসীমে জ্ঞান, সসীমে জ্ঞানের অপমৃত্যু

প্রকাশ- ২৩,মে,২০২০ঃ-
জ্ঞান অর্জনের প্রথম পূর্বশর্ত হলো "আমি কিছু জানি না" এটা অন্তর থেকে মেনে নেওয়া।  আবার জ্ঞানের উচ্চ পর্যায়ে গিয়েও বড় বড় জ্ঞানীরা বলে ফেলে আমি কিছু জানিনা এটা জ্ঞানের অসীমত্ব অনুধাবন করার ফলে৷ জ্ঞানীরা জ্ঞান অর্জন করতে করতে একসময় জেনে যায় হায় এ জ্ঞান তো শেষ হবার নয়, অফুরন্ত। তখনি বলে ফেলেন জ্ঞান অর্জন করতে গিয়ে আমি এটাই জেনেছি যে আমি কিছু জানিনা। এটাই বিনয়ের ভাষা, এটাই অসীম জ্ঞানের নিকট মাথানত করা৷
প্রকৃত জ্ঞানীরা বিনয়ী এবং নিরহংকারী। তারা যতটুকু জানে তার চেয়ে অনেক গুন কম জাহির করে।

জ্ঞানের সাথে চিন্তার সম্পর্কটি তেমন যেমন চিনির সাথে মিস্টির সম্পর্ক। জ্ঞানের পথে যাবার প্রথম পদক্ষেপ হলো চিন্তা করার প্রবনতা। চিন্তা চেতনায় অলস হলে মানবজীবনটাই বৃথা। কেননা আমাদেরকে চিন্তা করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে বলেই আমরা মানুষ। কেবল পেট ভরানোর আহার আর জৈবিক চাহিদা পশুরাও পূরন করে। সারাজীবন যদি পেটের চিন্তাই করে গেলাম তাহলে মানুষ আর পশুর জীবনযাপনের মধ্যে পার্থক্য কি থাকলো?

##ধর্মগ্রন্থ ও জ্ঞানীদের বচন অনুযায়ী জ্ঞান হলো অসীম।

স্রষ্টা যেমন অসীম তেমনি তার জ্ঞানরাজ্যও অসীম। জ্ঞানকে যদি আমরা নিজের মনমতো কোন সীমাবদ্ধ  পাত্রে আটকে দেই তাহলে স্রষ্টা যে আছে এটা বিশ্বাস হবে না আর যারা বিশ্বাস করে স্রষ্টা আছে তারা যদি স্রষ্টাকে সসীম ভাবে তবে তারা গোড়াবাদী হয়ে যায়। প্রবাদ আছে যে যেমন তার খোদাও তেমন। মানে নিজের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা দিয়ে পরিমাপ করা স্রষ্টাই হয় গোড়াবাদী ক্ষুদ্রচিন্তার এবং তাতে করে যে স্রষ্টা এই অসীম জ্ঞানরাজ্য সৃষ্টি করে রেখেছেন তাকে অমান্যই করা হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে জ্ঞানের অভাবে আমরা অসীম স্রষ্টার জ্ঞানকে কোরানের ৩০ পারায়, বাইবেলের কয়েকটা অধ্যায়ে, বেদের কিছু শ্লোকের আক্ষরিক অর্থ ও ব্যাখ্যার মধ্যে আটকে ফেলি।

 আমরা সময়ের ক্ষুদ্র আপেক্ষিক জ্ঞানের ভিত্তির উপর দাড়িয়ে থেকে অসীম ত্রিকাল জ্ঞানকে বিচার করে বন্দি করে ফেলি আর নিজের ক্ষুদ্র জ্ঞানের দর্শনকেই একমাত্র সঠিক দর্শন মনে করে অহংকার করি।  কেননা আমাদের এই সসীম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে অসীম সত্ত্বাকে মেনে নেয়া কোন সহজ বিষয় নয়। অনেক বিশাল হৃদয়ের অধিকারী হতে হয়। নিরহংকারী, বিনয়ী হতে হয়।

চিন্তা বিবেককে ঘুম পাড়িয়ে রেখে অন্ধ অনুসরন করার প্রবনতা একটি ব্যাক্তি এবং বৃহৎ অর্থে একটি জাতিকে পরনির্ভরশীল ও জড়বস্তুতে পরিনত করে। তাই চিন্তাকে বুদ্ধিকে অলস রেখে দেয়া মানে একটি মনের মৃত্যু ঘটানো, জ্ঞানের অপমৃত্যু তো বটেই। সম্পাদকের ভাষায়, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট, জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ মুক্তি সেখানে অসম্ভব।

ধর্মীয় জ্ঞানকে মানুষ আজীবন গন্ডিবদ্ধ করে গেছে, যে কারনে মনের মুক্তি মিলেনাই। অথচ গভীর অর্থে ভাবনার দুয়ার খুলতে গেলে দেখা যায় স্রষ্টা যদি অসীম হয় তাহলে তার পাঠানো গ্রন্থ সসীম হয় কি করে? আয়তনে সসীম হতে পারে কিন্তু অন্তর্নিহিত অর্থে তো কখনোই সসীম নয়।

 কোরানে স্রষ্টার ঘোষনা আছে যে কোরানের মর্মার্থ এতই বিশাল, অসীম ও গভীর যে পৃথিবীর সকল সাগর মহাসাগরের পানি কালি হলে আর সকল গাছ কলম হলেও লিখে শেষ করা যাবে না! মানে শেষ আর হবেনা থেকেই যাবে অর্থাৎ অসীম। তাই যদি কেউ ভেবে নেয়, গুটিকয়েক তফসিরকারক কোরান সম্পর্কে যতটুকু ব্যাখ্যা লিখে গেছেন সেটাই একমাত্র সঠিক সর্বশেষ ব্যাখ্যা এর বাহিরে আর নতুন কিছু জানবার নেই, বুঝবার নেই, চিন্তা করবার নেই তাহলে তারা অজ্ঞানতাবশত প্রত্যক্ষভাবে কোরানের এই অসীম জ্ঞানের বানীকেই অস্বীকার করলো! জ্ঞান যে অসীম সেটা আরো স্পষ্ট করে বোঝার জন্য স্রষ্টা বলেন,

★প্রত্যেক জ্ঞানীর উপরে আছে অধিকতর এক জ্ঞানীজন।
(ইউসুফ ৭৬)

##চিন্তার তালাবদ্ধ দ্বার উন্মোচন করেই জ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশ করতে হয়।

কিছু ধর্মীয় ব্যাক্তিরা আমাদের জ্ঞান দেয়, কোরান তো পানির মত সহজ।  এত বুঝে কি করবেন, পড়বেন আর সওয়াব কামাবেন। ব্যস! আবার কিছু নাস্তিকেরা বলে কোরান মুক্তচিন্তাকে সমর্থন করেনা! এই যে তারাও বুঝতে পারলো না ধর্মের মূল বিষয়টি!

আসুন দেখি চিন্তা সম্পর্কে কোরান কি বলে?

কোরান বলে,
#তারা কি কোরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে না? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?
(মুহম্মদ ২৪)

কোরানে আল্লাহ শুধু চিন্তা করতে বলছেন না বরং গভীর চিন্তা করতে বলছেন। শুধু চিন্তা দিয়ে কোরানের মর্মার্থ কোনদিনও উদ্ধার করা সম্ভব না। তালাবদ্ধ হৃদয়ের জ্ঞানের দ্বার খোলা কোন সাধারন সহজ ব্যাপার না। কিন্তু মানুষ তালাবদ্ধ হৃদয়ে নিজের মত করে বন্দি থাকতেই অধিক পছন্দ করে। অথচ বন্দিদশা বা বন্দিত্ব কখনো মানুষকে সত্য ও মুক্তির পথ দেখায়না তা সে মুসলিম ঘরে জন্ম নিক আর যাই হোক।

★আমি কোরআনকে বোঝার জন্যে সহজ করে দিয়েছি। অতএব, কোন চিন্তাশীল আছে কি?
(ক্বামার ১৭ ২২, ৩২, ৪০, ৫১)

একই সুরায় এই একটা কথাই ৫ বার বলা হয়েছে কথাটির গুরুত্ব যেনো মানুষ অনুধাবন করতে পারে। এখানে মুক্তভাবে চিন্তার জন্য আহবান জানানো হচ্ছে সার্বজনীন সকল মানুষদের। মানুষদের মধ্য থেকে চিন্তাশীলদের আহবান করা হচ্ছে বোঝার জন্য। কাজেই যে আস্তিকেরা বলে আল্লাহ অধিক চিন্তা করতে বারন করেছে আর কোরান খুবই সহজ গ্রন্থ তাদের কথা ভুল। যারা চোখ বন্ধ করে মুখস্থ করতেছেন কেবল, বুঝার মধ্যে নাই তাদের জন্য কোরান সহজ নয় বরং কঠিনেরও কঠিন।

কারন কোরান চিন্তাশীলদের বোঝার জন্য সহজ। যারা বোঝার চেষ্টায় অনবরত চিন্তা ফিকির করে তাদের জন্য সহজ। পাইকারী হারে সবার জন্য সহজ না মোটেও। এখন যেসব নাস্তিকেরা মনে করে ইসলাম ধর্ম মুক্তচিন্তা নিষেধ করে তারাও ভুল বুঝে। কারন হৃদয়ের দ্বার খুলে মুক্তভাবে চিন্তাশীল হবার আহবান কোরানে সুস্পষ্টভাবে আছে।

★যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান।
(যুমার ৯)

এখানে বলা হচ্ছে চিন্তাশীল কেবল বুদ্ধিমানরাই। মোটা মস্তিষ্কের লোকেরা চিন্তা ভাবনা কিছু করে না কেবল অন্ধ অনুসরনই এদের ভিত্তি। তাই যারা কেবল চিন্তা ব্যাতীত অনুকরন অনুসরনের ধর্ম পালন করে তারা কখনোই প্রকৃত ধার্মিক বা জ্ঞানী কোনটাই না। ★নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর তাকে পছন্দ করেছেন এবং স্বাস্থ্য ও জ্ঞানের দিক দিয়ে প্রাচুর্য দান করেছেন।
(সূরা আল বাকারা : ২৪৭)

মানে কেউ জ্ঞানহীন অন্ধ অনুসরন করে নিজেকে ধার্মিক সাজাবে এসবের কোন ভিত্তি নেই ধর্মে। ধার্মিক হতে হলে স্রষ্টার প্রিয় হতে হলে জ্ঞানী হতেই হবে।  তবে এ জ্ঞান কেবল আরবী ভাষা অন্ধভাবে মুখস্ত করা আর পরের লেখা তরজমা পড়ে,  কিছু লোককে অন্ধভাবে না বুঝে অনুসরণ করে কিছু মুখস্ত বুলি আওড়াবার জ্ঞান না৷ এটা অসীম সত্ত্বার অসীম জ্ঞান যে জ্ঞানের একটু স্পর্শ পেলেও অহংকার উগ্রতা ভুলে বিনয়ী হতে বাধ্য হবেন। ওটাই মানুষের মনুষ্যত্ব সৌন্দর্য বিকাশের জ্ঞান। অহংকারী হবার বিদ্যা নয়।

 তাই সবাইকে আহবান করবো জীবনের শত ব্যস্ততার মাঝে কিছুটা সময় বের করে হলেও চিন্তা করবেন। জ্ঞানের বই পড়বেন, সকল ধর্মগ্রন্থ নিরপেক্ষ মনে গভীরভাবে উপলব্ধি করার আশায় পড়বেন কেবল আক্ষরিক অর্থ বুঝা অথবা ভুল খুজে বের করার জন্য না। বরং গভীর মর্মার্থ উপলব্ধি করার আশায়। তাহলেই জীবনের গভীরেও যে একটি শিশুসুলভ পবিত্র অস্তিত্ব লুকিয়ে আছে আর সে গভীর অস্তিত্বের মাঝে বিরাজ করাই যে শান্তি ও মুক্তি সেটা বুঝতে পারবেন।

লেখিকা ----- ইসরাত জাহান  
Thanks For You Reading The Post We are very happy for you to come to our site. Our Website Domain name https://www.atikurbd.com/.
নবীনতর পোস্টসমূহ নবীনতর পোস্টসমূহ পুরাতন পোস্টসমূহ পুরাতন পোস্টসমূহ

আরও পোস্ট

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন